পলিটেকনিক শিক্ষার ইতিহাস: বিশ্ব প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশ

 

পলিটেকনিক শিক্ষার ইতিহাস

"পলিটেকনিক" শব্দটি গ্রিক শব্দ 'Poly' (অনেক) এবং 'Teckne' (কলা বা শিল্প) থেকে এসেছে। এর শাব্দিক অর্থ হলো "বহুমুখী শিল্পকলা বা কারিগরি বিদ্যা"। এটি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা যেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞানের চেয়ে ব্যবহারিক বা হাতে-কলমে শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পলিটেকনিকের সূচনা

পলিটেকনিক শিক্ষার ধারণাটি মূলত শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে বিকশিত হয়েছে।

  • প্রথম পলিটেকনিক: ১৭৯৪ সালে ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠিত 'École Polytechnique'-কে বিশ্বের প্রথম পলিটেকনিক হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি মূলত সামরিক ও প্রকৌশলগত প্রশিক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

  • যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ: ১৮ ও ১৯ শতকে শিল্প বিপ্লবের ফলে যখন কল-কারখানার প্রসার ঘটে, তখন কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন বেড়ে যায়। ১৮৩৮ সালে লন্ডনে 'Royal Polytechnic Institution' প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সাধারণ মানুষের কাছে কারিগরি শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়।


বাংলাদেশে পলিটেকনিক শিক্ষার বিকাশ

আমাদের এই অঞ্চলে কারিগরি শিক্ষার ইতিহাস ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হলেও পাকিস্তান আমলে তা পূর্ণতা পায়।

১. প্রাথমিক পর্যায় (ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল)

  • ১৮৭৬ সালে বর্তমান বুয়েট চত্বরে 'ঢাকা সার্ভে স্কুল' প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল নামে পরিচিত হয়। এটিই ছিল এই অঞ্চলে টেকনিক্যাল শিক্ষার ভিত্তি।

  • ১৯৫৪ সালে আমেরিকার ফোর্ড ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন শুরু হয়।

  • ১৯৫৫ সাল: এই বছর বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) প্রথম পূর্ণাঙ্গ পলিটেকনিক হিসেবে 'ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট' প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা পলিটেকনিক স্থাপিত হয়।

২. স্বাধীনতা পরবর্তী ও বর্তমান সময়

  • কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (BTEB): ১৯৭২ সালে 'বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড' একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এটি সারা দেশের পলিটেকনিকগুলোর পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ করে।

  • নারীদের অংশগ্রহণ: একটা সময় পলিটেকনিকে শুধু ছেলেদের প্রাধান্য থাকলেও বর্তমানে মেয়েদের জন্য আলাদা পলিটেকনিক (যেমন: ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক) এবং সাধারণ পলিটেকনিকেও মেয়েদের কোটা ও সুযোগ বৃদ্ধি করা হয়েছে।


কেন পলিটেকনিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ?

পলিটেকনিকের ইতিহাস মূলত দক্ষ জনশক্তি তৈরির ইতিহাস। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • ব্যবহারিক শিক্ষা: ক্লাসরুমের চেয়ে ল্যাবরেটরি বা ওয়ার্কশপে বেশি সময় কাটানো।

  • ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং: ৪ বছর মেয়াদী এই কোর্স শেষে শিক্ষার্থীরা 'উপ-সহকারী প্রকৌশলী' হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে।

  • দ্রুত কর্মসংস্থান: সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কারিগরি শিক্ষার্থীরা দ্রুত চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পায়।


বর্তমান অবস্থা: বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক এবং কয়েকশ বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট রয়েছে। বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট শিক্ষার্থীর ৩০ শতাংশকে কারিগরি শিক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

প্রয়োজনীয় বিডি 24 নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url